Dhaka ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :
নগরীতে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ৯ নগরীতে মাদকবিরোধী অভিযানে ১ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছায় স্বাগত জানালেন রাসিক প্রশাসক রাসিক প্রশাসকের সঙ্গে শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনারদের মতবিনিময় রাজশাহীতে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২এর উদ্বোধন ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের স্টিয়ারিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত নগরীতে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ৯ কৃষিপণ্য আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসাই সরকারের লক্ষ্য : কৃষিমন্ত্রী নগরীতে মাদকবিরোধী অভিযানে ১ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার পুঠিয়ায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২-এর শুভ উদ্বোধন

রাজশাহীতে ২১৬ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বর্জ্য যাচ্ছে ড্রেনে,বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:০০:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৬ Time View






স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীতে চিকিৎসাসেবা মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে, অথচ সেই চিকিৎসাসেবা থেকেই প্রতিদিন তৈরি হওয়া বিপজ্জনক তরল বর্জ্যের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে নগরীর ড্রেন ও নালায়। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে বর্জ্য শোধনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় রক্ত, শরীরের বিভিন্ন তরল, রাসায়নিক পদার্থ ও জীবাণুসমৃদ্ধ বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে শুধু পানি ও পরিবেশ দূষণ নয়, নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকিও ক্রমে বাড়ছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, রাজশাহীতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২১৬টি। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কার্যকর এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) রয়েছে মাত্র দুটিতে। অর্থাৎ ২১৪টি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানেই তরল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

এই ঘাটতির বাস্তব চিত্র পাওয়া গেছে রাজশাহীর লক্ষীপুর এলাকায় সরেজমিন ঘুরে। চিকিৎসাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় দেখা গেছে তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের চিহ্ন। নগরীর বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বর্জ্যও ড্রেনের মাধ্যমে বাইরে চলে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও তরল বর্জ্যের পাশাপাশি চিকিৎসায় ব্যবহৃত অন্যান্য বর্জ্যও পড়ে থাকতে দেখা যায়।

নিয়ম অনুযায়ী, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে উৎপন্ন তরল বর্জ্য শোধনের পর নিরাপদভাবে নিষ্কাশন করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ইটিপি না থাকায় শোয়ারেজ বা ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে এসব বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। ফলে বর্জ্য কোথায় গিয়ে মিশছে, কীভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে এবং শেষ পর্যন্ত তা জনস্বাস্থ্যের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে- এসব প্রশ্নেরও যথাযথ উত্তর মিলছে না।

নগরীর ড্রেন ও নালাগুলো দিয়ে প্রবাহিত পানি শেষ পর্যন্ত পবা এলাকার দিকে যায় এবং সিটি করপোরেশনের ড্রেনের পানি বারনই নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া অপরিশোধিত তরল বর্জ্য শুধু নগরীর ড্রেনেই আটকে থাকছে না; এর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে বৃহত্তর পরিবেশে। পানি ও মাটিতে ক্ষতিকর উপাদান মিশে যাওয়ার পাশাপাশি বর্জ্যের সঙ্গে থাকা জীবাণু মানুষের সংস্পর্শে এলে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

পবা উপজেলার বাসিন্দা আবদুস সালামের অভিজ্ঞতা সেই ঝুঁকিরই একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তিনি বলেছেন, এলাকার ড্রেনে প্রায়ই মেডিকেল বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। রক্ত, তুলা, গজসহ বিভিন্ন বর্জ্য ড্রেনের পানিতে ভাসতে থাকে। এসব বর্জ্য থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়ায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ওই পানিতে নামতে হয়। তখন সিরিঞ্জ, তার বা কাচের বোতলের মতো বর্জ্যে পা কেটে যায়। পরে ওই স্থানে চুলকানি ও ঘা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মর্জিনা বেগমের কন্ঠে উঠে আসে একই ধরনের বাস্তবতা। তিনি বললেন, ড্রেনের পানি অত্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। ওই পানিতে নামলে কিংবা পা ভিজলে পরে শরীরে চুলকানি শুরু হয়। অনেক সময় পায়ে ছোট ছোট ঘাও হয়ে যায়। ড্রেনে মেডিকেল বর্জ্য ফেলা বন্ধ না হলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

রুহুল আমিন নামের আরেক বাসিন্দা জানালেন, ড্রেনে শুধু ময়লা পানি নয়, চিকিৎসার পর ব্যবহৃত বিভিন্ন বর্জ্যও দেখা যায়। এসব বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। কখনো ড্রেনের পানি রাস্তায় উঠে এলে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ওই পানি শরীরে লাগলে চুলকানি ও ঘায়ের সমস্যা দেখা দেয়।

সোহেল রানা নামের আরেকজন বললেন, ড্রেনের পানিতে নামার পর পায়ে কাটা বা ক্ষত হলে সেটি সহজে ভালো হতে চায় না। ক্ষতস্থানে চুলকানি হয় এবং অনেক সময় ঘা হয়ে যায়। তার ভাষায়, মেডিকেল বর্জ্য এভাবে ড্রেনে ফেলা হলে শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের শরীরও সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ছে। দ্রুত এসব বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা দরকার।

তবে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের কয়েকজনের বক্তব্যে উঠে এসেছে ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কথাও। তারা জানালেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য ইটিপি নেই। শোয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে তরল বর্জ্য অপসারণ করা হয়। কিন্তু এই বর্জ্য শেষ পর্যন্ত নগরীর ড্রেন ও নালায় গিয়ে পড়ছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর নজরদারি নেই।

রাজশাহী বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ বিষয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেছেন, বর্তমানে তারা একটি হাসপাতালের একটি বাথরুমে এসব বর্জ্য কিছুটা পরিশোধন করে শোয়ারেজ লাইনে দেন। সরকার যদি পুরোপুরি বর্জ্য পরিশোধনের নির্দেশ দেয়, তাহলে তারা তা মেনে চলবেন। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে চাইলেই ইটিপি বসানো সম্ভব নয়। সময় দেওয়া হলে তারা ইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেবেন বলেও জানালেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্যে রোগজীবাণু, বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ও রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। সেগুলো যথাযথভাবে শোধন না করে পরিবেশে ছেড়ে দিলে পানি ও মাটি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যেও দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, হাসপাতালের তরল বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকতে পারে। এসব বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে গেলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বললেন, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এর আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা ও সতর্কবার্তাও দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানালেন, চলতি বছরে তরল বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ চারটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তারা শোধনাগার নির্মাণ করবে বলে আশা করছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস. আই. এম. রাজিউল করিম বলেছেন, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। যারা নিয়ম মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যথাযথভাবে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

 


Post Views: 4

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।

Bangla Photocard Generatorv3.7
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

নগরীতে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ৯

রাজশাহীতে ২১৬ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বর্জ্য যাচ্ছে ড্রেনে,বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

Update Time : ০৩:০০:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬






স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীতে চিকিৎসাসেবা মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে, অথচ সেই চিকিৎসাসেবা থেকেই প্রতিদিন তৈরি হওয়া বিপজ্জনক তরল বর্জ্যের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে নগরীর ড্রেন ও নালায়। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে বর্জ্য শোধনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় রক্ত, শরীরের বিভিন্ন তরল, রাসায়নিক পদার্থ ও জীবাণুসমৃদ্ধ বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে শুধু পানি ও পরিবেশ দূষণ নয়, নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকিও ক্রমে বাড়ছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, রাজশাহীতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২১৬টি। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কার্যকর এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) রয়েছে মাত্র দুটিতে। অর্থাৎ ২১৪টি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানেই তরল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

এই ঘাটতির বাস্তব চিত্র পাওয়া গেছে রাজশাহীর লক্ষীপুর এলাকায় সরেজমিন ঘুরে। চিকিৎসাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় দেখা গেছে তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের চিহ্ন। নগরীর বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বর্জ্যও ড্রেনের মাধ্যমে বাইরে চলে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও তরল বর্জ্যের পাশাপাশি চিকিৎসায় ব্যবহৃত অন্যান্য বর্জ্যও পড়ে থাকতে দেখা যায়।

নিয়ম অনুযায়ী, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে উৎপন্ন তরল বর্জ্য শোধনের পর নিরাপদভাবে নিষ্কাশন করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ইটিপি না থাকায় শোয়ারেজ বা ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে এসব বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। ফলে বর্জ্য কোথায় গিয়ে মিশছে, কীভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে এবং শেষ পর্যন্ত তা জনস্বাস্থ্যের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে- এসব প্রশ্নেরও যথাযথ উত্তর মিলছে না।

নগরীর ড্রেন ও নালাগুলো দিয়ে প্রবাহিত পানি শেষ পর্যন্ত পবা এলাকার দিকে যায় এবং সিটি করপোরেশনের ড্রেনের পানি বারনই নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া অপরিশোধিত তরল বর্জ্য শুধু নগরীর ড্রেনেই আটকে থাকছে না; এর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে বৃহত্তর পরিবেশে। পানি ও মাটিতে ক্ষতিকর উপাদান মিশে যাওয়ার পাশাপাশি বর্জ্যের সঙ্গে থাকা জীবাণু মানুষের সংস্পর্শে এলে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

পবা উপজেলার বাসিন্দা আবদুস সালামের অভিজ্ঞতা সেই ঝুঁকিরই একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তিনি বলেছেন, এলাকার ড্রেনে প্রায়ই মেডিকেল বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। রক্ত, তুলা, গজসহ বিভিন্ন বর্জ্য ড্রেনের পানিতে ভাসতে থাকে। এসব বর্জ্য থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়ায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ওই পানিতে নামতে হয়। তখন সিরিঞ্জ, তার বা কাচের বোতলের মতো বর্জ্যে পা কেটে যায়। পরে ওই স্থানে চুলকানি ও ঘা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মর্জিনা বেগমের কন্ঠে উঠে আসে একই ধরনের বাস্তবতা। তিনি বললেন, ড্রেনের পানি অত্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। ওই পানিতে নামলে কিংবা পা ভিজলে পরে শরীরে চুলকানি শুরু হয়। অনেক সময় পায়ে ছোট ছোট ঘাও হয়ে যায়। ড্রেনে মেডিকেল বর্জ্য ফেলা বন্ধ না হলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

রুহুল আমিন নামের আরেক বাসিন্দা জানালেন, ড্রেনে শুধু ময়লা পানি নয়, চিকিৎসার পর ব্যবহৃত বিভিন্ন বর্জ্যও দেখা যায়। এসব বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। কখনো ড্রেনের পানি রাস্তায় উঠে এলে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ওই পানি শরীরে লাগলে চুলকানি ও ঘায়ের সমস্যা দেখা দেয়।

সোহেল রানা নামের আরেকজন বললেন, ড্রেনের পানিতে নামার পর পায়ে কাটা বা ক্ষত হলে সেটি সহজে ভালো হতে চায় না। ক্ষতস্থানে চুলকানি হয় এবং অনেক সময় ঘা হয়ে যায়। তার ভাষায়, মেডিকেল বর্জ্য এভাবে ড্রেনে ফেলা হলে শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের শরীরও সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ছে। দ্রুত এসব বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা দরকার।

তবে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের কয়েকজনের বক্তব্যে উঠে এসেছে ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কথাও। তারা জানালেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য ইটিপি নেই। শোয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে তরল বর্জ্য অপসারণ করা হয়। কিন্তু এই বর্জ্য শেষ পর্যন্ত নগরীর ড্রেন ও নালায় গিয়ে পড়ছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর নজরদারি নেই।

রাজশাহী বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ বিষয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেছেন, বর্তমানে তারা একটি হাসপাতালের একটি বাথরুমে এসব বর্জ্য কিছুটা পরিশোধন করে শোয়ারেজ লাইনে দেন। সরকার যদি পুরোপুরি বর্জ্য পরিশোধনের নির্দেশ দেয়, তাহলে তারা তা মেনে চলবেন। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে চাইলেই ইটিপি বসানো সম্ভব নয়। সময় দেওয়া হলে তারা ইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেবেন বলেও জানালেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্যে রোগজীবাণু, বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ও রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। সেগুলো যথাযথভাবে শোধন না করে পরিবেশে ছেড়ে দিলে পানি ও মাটি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যেও দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, হাসপাতালের তরল বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকতে পারে। এসব বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে গেলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বললেন, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এর আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা ও সতর্কবার্তাও দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানালেন, চলতি বছরে তরল বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ চারটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তারা শোধনাগার নির্মাণ করবে বলে আশা করছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস. আই. এম. রাজিউল করিম বলেছেন, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। যারা নিয়ম মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যথাযথভাবে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

 


Post Views: 4

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।

Bangla Photocard Generatorv3.7