পিন্টু আলী , চারঘাট : ‘আপনার সন্তান মাদকদ্রব্যসহ আমাদের হাতে ধরা পড়েছে।’ ফোনের ওপাশ থেকে এমন কথা শুনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা।
এরপর নিজেকে পুলিশ বা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মামলা, আদালত ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে।
বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে শোনানো হচ্ছে পুলিশের ওয়্যারলেস ও গাড়ির সাইরেনের শব্দ। কখনও আবার শোনানো হচ্ছে সন্তানের কান্নার মতো কণ্ঠ। একপর্যায়ে মামলা থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বিকাশ বা নগদে দ্রুত টাকা পাঠানোর চাপ দেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহীর চারঘাটে এমন কৌশলে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের টার্গেট করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সম্প্রতি একই ধরনের একাধিক ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে উপজেলার শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উপজেলা সদরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের বাছাই করে ফোন করছে চক্রটি। গত এক মাসে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে ফোন করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতারকরা ফোনে অভিভাবকের সন্তানের নাম, শ্রেণি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামও বলে। ফলে অনেকেই প্রথমে বিষয়টি সত্য বলে ধরে নেন। পরে বিকাশ বা নগদে টাকা পাঠানোর পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, সন্তান নিরাপদেই বাড়িতে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে।
গত ২৪ আগস্ট দুপুরে উপজেলার পিরোজপুর (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুরাদ আলীর মোবাইল ফোনে কল আসে। ফোনে জানানো হয়, তাঁর ছেলেকে মাদক কারবারিদের সঙ্গে আটক করা হয়েছে। এরপর সন্তানের কণ্ঠ নকল করে কান্নার মতো আওয়াজ শোনানো হয়। মামলা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে দ্রুত ৩০ হাজার টাকা পাঠাতে বলা হয় তাঁকে।
মুরাদ আলী বলেন, ‘আমার ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মাদক কারবারিদের সঙ্গে আটক হয়েছে বলার পর ওয়্যারলেস ও পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ শুনে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। তারা বলে, কারও সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করলে ছেলের ক্ষতি হবে। ফোন না কাটতেও বলা হয়। ভয়ে বাড়ি থেকে টাকা এনে তাদের দেওয়া নম্বরে ৩০ হাজার টাকা পাঠাই। পরে বাসায় গিয়ে দেখি ছেলে ঘুমাচ্ছে।’
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, থানায় অভিযোগ দেওয়ার ১০ দিন পার হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) উপজেলার আশকরপুর এলাকার বাসিন্দা মো. মনিরুজ্জামানের কাছে ফোন করে নিজেকে পুলিশের এসআই পরিচয় দেন এক ব্যক্তি। তাঁর ছেলেকে মাদক কারবারিদের সঙ্গে আটক করা হয়েছে বলে ভয় দেখানো হয়। পরে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে সন্তানের কান্নার শব্দ শোনানো হয়। ছেলেকে ছাড়িয়ে নিতে ৪০ হাজার টাকা দাবি করে চক্রটি।
মনিরুজ্জামান বলেন, ‘প্রথমে ২০ হাজার টাকা পাঠাই। এরপর সাংবাদিকদের দিতে হবে বলে আরও ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। তখন আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কথা বলি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আমার ছেলে ক্লাসে আছে। তখন বুঝতে পারি, এটা প্রতারকচক্র।’ এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করেছেন তিনি।
একই কায়দায় গত ৩০ আগস্ট উপজেলার বড়বড়িয়া এলাকার হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে ২৪ হাজার টাকা এবং ২৭ আগস্ট রায়পুর এলাকার আলতাফ হোসেনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপজেলায় এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে মোট কতজন অভিভাবক অর্থ খুইয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি থানা পুলিশ। তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও বিত্তশালী অভিভাবকদের টার্গেট করে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে ফোন করেছে চক্রটি। এর মধ্যে অর্থ খুইয়েছেন অর্ধ শতাধিক ভুক্তভোগী।
উপজেলার রাওথা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপু রায়হান বলেন, ‘আমাকেও একই কায়দায় ফোন করে প্রতারণার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে বাসায় ফোন করে জানতে পারি, ছেলে বাসাতেই আছে। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেছি।’
চারঘাট উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমাকেও ফোন করে একই কায়দায় আমার ছেলের কথা বলে প্রতারণার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে এভাবে ফোন করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষক সম্মানের কথা ভেবে সরল মনে টাকা দিয়ে দিচ্ছেন। প্রতারকদের ব্যবহৃত নম্বরগুলো সংগ্রহ করে থানায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
প্রতারকরা শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য কীভাবে পাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব ব্যক্তিগত তথ্যের নির্দিষ্ট উৎস এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে তেমন কোনো প্রচার বা কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ ও ডিবির পরিচয়ে অভিভাবকদের ফোন করে টাকা দাবির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রতারকচক্রকে শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। তবে অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকতে হবে।’
Post Views: 5
Reporter Name 























